বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণপাড় মিটুয়াখেয়া ঘাট সংলগ্ন তেতুলিয়া নদীতে সরকারি ড্রেজিং ও বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের সঙ্গে ড্রেজার কর্তৃপক্ষের বিরোধের জেরে হামলা, ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় হাতেম সিকদার ও মনির সিকদার ওরফে লাল মিয়াসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামী করা হয়েছে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত আসামী হিসেবে সুলাইমান নামে এক ফার্মেসি ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নৌযান চলাচলের উপযোগী করতে সরকারিভাবে ড্রেজার দিয়ে নদী খননের কাজ চলছে। দক্ষিণপাড় মিটুয়াখেয়া ঘাট এলাকার বাসিন্দারা দাবি করেন, ড্রেজিংয়ে উত্তোলিত বালু যেন মিটুয়া এলাকাতেই ফেলা হয়। তবে তাদের অভিযোগ, বালু সেখানে না ফেলে স্টিমারঘাট এলাকায় ফেলা হচ্ছিল। এ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে ড্রেজারে কর্মরতদের তর্ক-বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনার জেরে গত ৩ মে সন্ধ্যায় উভয়পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। পরে এ ঘটনায় ৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। যদিও পরবর্তীতে দায়ের হওয়া মামলায় মোট ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
থানা ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের অর্থায়নে বঙ্গ ড্রেজার লিমিটেডের মাধ্যমে গত চার বছর ধরে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার মাসকাটা নদীতে সরকারি খনন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
এজাহারে বঙ্গ ড্রেজার লিমিটেডের কর্মী মোঃ বিদ্যা সাগর অভিযোগ করেন, গত ৩ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে মেহেন্দিগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড চুনারচর এলাকার পাতারহাট লঞ্চঘাট সংলগ্ন ভোলা-ভেদুরিয়া রুটের মাসকাটা নদীতে অবস্থানরত “বঙ্গ পদ্মা ড্রেজার”-এ একদল লোক অতর্কিত হামলা চালায়।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, ১ নম্বর আসামী হাতেম সিকদার (৬৫) ও ২ নম্বর আসামী মনির সিকদার ওরফে লাল মিয়া (৪০)-এর নেতৃত্বে অন্যান্য আসামীরা ট্রলারযোগে ড্রেজারের কাছে এসে বেআইনিভাবে উপরে উঠে দা, লাঠিসোটা ও লোহার রড দিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় ড্রেজারের ব্রিজ রুমের জানালার কাঁচ, অপারেটিং চেয়ার, কন্ট্রোল বোর্ডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া হামলাকারীরা ড্রেজারে কর্মরত শ্রমিকদের মারধর করে আহত করে বলেও এজাহারে বলা হয়েছে। আহত আব্দুল করিমকে লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে পিটিয়ে জখম করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ৩ নম্বর আসামী ফকরুল জমাদ্দার ধারালো দা নিক্ষেপ করে হত্যার চেষ্টা চালায় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত আসামীরা হলেন— হাতেম সিকদার (৬৫), মনির সিকদার ওরফে লাল মিয়া (৪০), ফকরুল জমাদ্দার (২৫), জুয়েল মাঝি (৪০), মোস্তাক ঘরামী (৫২), সলেমান মাঝি (২৬), রতন রাড়ী (৫৫), মেহেদি হাসান বাঘা (২৫), মুসা জমাদ্দার (৪৫), সবুজ সিকদার (৫২), হানিফ গাজী (৪৫), চান মিয়া আকন (৫০) ও নাসির খা (৩৮)। তাদের সকলের বাড়ি মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ৮ নম্বর চর গোপালপুর ইউনিয়নের জালির চর এলাকায়। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামী করা হয়েছে।
ঘটনার পর তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযান চালিয়ে অজ্ঞাত আসামী সুলাইমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। স্থানীয়দের দাবি, বাংলাবাজার এলাকার ওই ফার্মেসি ব্যবসায়ী সুলাইমানের নাম মামলার তালিকায় না থাকলেও গভীর রাতে প্রশাসনের একাধিক সদস্য তাকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
স্থানীয়রা বলেন, “হয়তো অজ্ঞাতনামা আসামী হিসেবেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু সে কোনো অপরাধ করেনি। এলাকার মানুষের পক্ষে ন্যায্য দাবি জানিয়েছিল। এজন্য তার মতো ভদ্র ছেলেকে এভাবে গ্রেফতার করা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, মামলার এজাহারভুক্ত ও অন্যান্য অজ্ঞাত আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
