হিজলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সম্ভাবনা, সেতু হলে বদলে যেতে পারে মেহেন্দিগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

শরীয়তপুর হয়ে বরিশালের হিজলা উপজেলা পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। প্রস্তাবিত এই রেললাইন বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু শরীয়তপুর ও হিজলা উপজেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। যথাযথ পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন করা হলে নদীবেষ্টিত মেহেন্দিগঞ্জও এই রেল যোগাযোগের অন্যতম বড় উপকারভোগী হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নির্দেশনায় পদ্মা সেতুর মাধ্যমে শরীয়তপুর সদর, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাট হয়ে বরিশালের হিজলা পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো এবং দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

মেহেন্দিগঞ্জের পাশের উপজেলা হিজলা। দুই উপজেলার মাঝখানে রয়েছে কালাবদর ও ধর্মগঞ্জ নদী। এই দুই উপজেলার মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ করা গেলে মেহেন্দিগঞ্জ প্রথমবারের মতো দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হিজলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হলে সেতু ও সংযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে মেহেন্দিগঞ্জের মানুষও সেই রেল যোগাযোগের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমানে মেহেন্দিগঞ্জের অন্যতম বড় সমস্যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। স্থল যোগাযোগ না থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও নানা ঝুঁকি রয়েছে। নদীর তলদেশ দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন এনে পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নৌযান দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো কারণে এসব লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হয় পুরো উপজেলা। এতে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প ও মানুষের দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ সেতু নির্মিত হলে স্থলপথে বিকল্প ও আরও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ চালু হলে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন সহজ হবে, কমবে পরিবহন ব্যয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ আরও গতিশীল হবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে মেহেন্দিগঞ্জের মানুষকে এখনো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতে প্রধানত নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। লঞ্চে ঢাকায় যেতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং তুলনামূলকভাবে ব্যয়ও বেশি। সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে এই জনপদ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হিজলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু নির্মাণের বিষয়টি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হলে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সেতুটি নির্মিত হলে মেহেন্দিগঞ্জের মানুষ সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে হিজলা হয়ে রেল যোগাযোগের সুবিধাও গ্রহণ করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, এর আগে সাবেক সংসদ সদস্য পংকজ নাথ মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সরকারি পর্যায়ে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ ও প্রাথমিক জরিপের কাজও সম্পন্ন হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়নের দিকে এগোয়নি।

বর্তমানে মেহেন্দিগঞ্জের সংসদ সদস্য রাজিব আহসান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, হিজলা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তিনি মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবেন এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

মেহেন্দিগঞ্জবাসীর বিশ্বাস, হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ সেতু শুধু দুই উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করবে না; এটি বিদ্যুৎ সংকট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও অর্থনৈতিক পিছিয়ে পড়ার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানের পথও খুলে দিতে পারে। আর হিজলা পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়িত হলে সেই সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে।

হিজলা পর্যন্ত রেললাইন—তার সঙ্গে মেহেন্দিগঞ্জ-হিজলা সেতু—এই দুই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নদীবেষ্টিত মেহেন্দিগঞ্জ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক ও সম্ভাব্য রেল যোগাযোগের আওতায় এসে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে।