ছোট হচ্ছে বরিশালের মানচিত্র, নদীভাঙনের করাল গ্রাসে অস্তিত্ব সংকটে মেহেন্দিগঞ্জ

লেখক: নিউজ ডেস্ক। মেহেন্দিগঞ্জ প্রতিদিন
প্রকাশ: ২০ ঘন্টা আগে

নদীভাঙনের ফলে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে বরিশালের ভৌগোলিক মানচিত্র। কীর্তনখোলা, পদ্মা, মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া ও সন্ধ্যাসহ অসংখ্য নদ-নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিবছর বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তবে বরিশাল বিভাগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভাঙন আতঙ্কে রয়েছে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১৬টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকাই নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। চানপুর, উলানিয়া, আলিমাবাদ, শ্রীপুর, চরগোপালপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতি বছর নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত একর আবাদি জমি ও অসংখ্য বসতবাড়ি। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার একাধিকবার স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগের প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে বিভাগের অন্তত ১০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বিভিন্ন ইটভাটায় নদীতীর কেটে মাটি নেওয়ার ফলে ভাঙনের মাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর হাজারো মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেন।

মেহেন্দিগঞ্জ ও হিজলা উপজেলায় মেঘনা নদীর ভাঙন ইতোমধ্যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হিজলার গৌরবদী ইউনিয়ন প্রায় বিলীন হওয়ার পথে, আর মেহেন্দিগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে নদী প্রতিনিয়ত নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করছে।

উপজেলার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ মোল্লা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “যে মাটিতে শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজ পুরোটাই মেঘনা নদীর গর্ভে। পাকা ঘরবাড়ি, ধানি জমি, বাপ-দাদার ভিটে সবকিছু চোখের সামনে তলিয়ে গেছে।”

একই এলাকার রাবেয়া বেগম বলেন, “নদী যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত বাঁধ না দিলে পুরো এলাকা একদিন মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।” তিনি ত্রাণ নয়, শেষ সম্বল রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

এদিকে মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলায় সন্ধ্যা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর তীব্র ভাঙনে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাবুগঞ্জ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিই বর্তমানে ভাঙনকবলিত।

বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ও শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নও কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চরবাড়িয়ায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল ছালাম গাজী বলেন, “নদী সব কেড়ে নিয়েছে। তিনবার বাড়ি হারিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন এই জায়গাটিও ভাঙনের মুখে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীতে ডুবে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।”

১৯৮৪ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হচ্ছে বরিশাল বিভাগের ভূখণ্ড। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, “অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিবছর মানুষ বাস্তুহারা হচ্ছেন।”

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ ১০২ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষায় গত ৫ থেকে ৮ বছরে অন্তত ১০টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও অধিকাংশ প্রকল্প এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া জানান, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধ ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”

নদীভাঙনের অব্যাহত আঘাতে আজ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে মেহেন্দিগঞ্জের মানুষ। তাদের একটাই দাবি—ত্রাণ নয়, টেকসই নদীশাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ভিটেমাটি রক্ষার নিশ্চয়তা।