মেহেন্দিগঞ্জ পৌরসভার ,,৯ নং ওয়ার্ডের চুনারচর গ্রামের কৃতী সন্তান, বর্ষীয়ান শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ মরহুম আবুল কাশেম সিকদার-এর মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছেন তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মরহুম আবুল কাশেম সিকদারের জন্ম ১৫ জুন ১৯৩৫ সালে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৬ মেয়ে ও ১ ছেলের জনক ছিলেন। শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে তাঁর অবদান আজও মেহেন্দিগঞ্জবাসীর কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থেকে আদর্শ শিক্ষক
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ১৯৬১ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানে দুই বছর কর্মরত ছিলেন। পরে শিক্ষাবিদ আব্দুল জব্বার খন্দকারের উৎসাহে চাকরি ছেড়ে ১৯৬৩ সালে সরকারি পাতারহাট মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৯৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করলেও শিক্ষার্থীদের অনুরোধ ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ২০০৭ সাল পর্যন্ত একই বিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন তিনি।
রাজনীতিতেও ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা
ছাত্রজীবনে তিনি বরিশাল বিএম কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পরে স্বেচ্ছায় সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন।
শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার
১৯৯৯ সালের এসএসসি ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আসাদুজ্জামান পলাশ স্মৃতিচারণ করে বলেন, কাশেম স্যার শুধু পাঠ্যবই পড়াতেন না; বরং দেশ-বিদেশের নানা অজানা তথ্য জানাতে ভালোবাসতেন। তিনি বলেন, ১৯৯১-৯২ সালের দিকেই বিদ্যালয়ের ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয়তে স্যার ‘রোবোটিক্স’ নিয়ে লিখেছিলেন, যা তাঁর দূরদর্শী চিন্তার প্রমাণ।
একদিন ক্লাসে স্কুল লাইব্রেরির কথা বলার পর তিনি আগ্রহ প্রকাশ করে বই নিতে চান। টিফিনের সময় সত্যিই বই নিতে গেলে স্যার কিছুটা অবাক হলেও তাঁর বই পড়ার আগ্রহে অত্যন্ত খুশি হন। কয়েকদিন পর স্যার নিজ হাতে তাঁকে ইমদাদুল হক মিলনের “ফার্স্ট বয় সেকেন্ড বয়” উপন্যাসটি উপহার দেন। সেই উপহার আজও তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।
শৃঙ্খলা, ব্যক্তিত্ব ও জীবনবোধের অনন্য শিক্ষক
২০০৫ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ওয়ালীউল্লাহ বলেন, কাশেম স্যার মানেই ছিল পাহাড়সম দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা। মাধ্যমিক জীবনের প্রতিটি ইংরেজি ক্লাস আজও তাঁর কাছে স্মরণীয়।
তিনি জানান, স্যার শুধু ইংরেজি পড়াতেন না; বরং বাস্তব জীবনের নানা বিষয় শেখাতেন। হাইকমিশনার ও অ্যাম্বাসেডরের পার্থক্য, এজেন্ট ও টেন্ডারের পার্থক্য, ডিনার টেবিলে কাঁটা-চামচ ব্যবহারের নিয়ম, ভাষার ব্যবহার, বিভিন্ন শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ—এসব বিষয় নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষার্থীদের সহজভাবে বুঝিয়ে দিতেন।
ওয়ালীউল্লাহ আরও বলেন, বার্ষিক বিচিত্রানুষ্ঠান, মহড়া, বিদ্যালয়ের ম্যাগাজিন সম্পাদনা—সবক্ষেত্রেই কাশেম স্যারের নেতৃত্ব ছিল অসাধারণ। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ আজও শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে।
শ্রদ্ধা আর দোয়ায় স্মরণ
মৃত্যুবার্ষিকীতে মরহুম আবুল কাশেম সিকদারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তাঁর সাবেক শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসী মহান আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস কামনা করেছেন।
শিক্ষক, সংগঠক, রাজনীতিবিদ ও আলোকিত মানুষ হিসেবে আবুল কাশেম সিকদার শুধু একটি নাম নন; তিনি মেহেন্দিগঞ্জের শিক্ষা ও সমাজজীবনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়, যার অবদান আগামী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
